আজ ২২শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৬ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

কর্ণফুলী টানেলের পাশে ৪৫০ কোটি টাকার অতিথিশালা অলস, তৃতীয়বার আন্তর্জাতিক দরপত্র

সাইফুল ইসলাম চট্টগ্রাম

 দুই দফায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সাড়া মেলেনি, ২৯ বছরের জন্য বেসরকারি খাতে ইজারা দিয়ে রাজস্ব বাড়াতে নতুন উদ্যোগ চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত কর্ণফুলী টানেলের আনোয়ারা প্রান্তে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিলাসবহুল অতিথিশালাটি নির্মাণের পরও দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারহীন পড়ে আছে। পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় চালু করা সম্ভব না হওয়ায় রাষ্ট্রীয় এ সম্পদ এবার তৃতীয়বারের মতো আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ২৯ বছরের জন্য বেসরকারি খাতে ইজারা দিতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।সেতু কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরের জুলাই ও সেপ্টেম্বর মাসে একই শর্তে দুই দফা আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়নি। কয়েকটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশগ্রহণ করলেও তাদের প্রস্তাবিত মূল্য কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত প্রাক্কলনের চেয়ে কম হওয়ায় তা বাতিল করা হয়। ফলে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে আবারও আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আগামী ১৩ জুলাই পর্যন্ত দরপত্র জমা নেওয়া যাবে।দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, নির্বাচিত ইজারাদারের কাছে অতিথিশালার সব স্থাপনা বর্তমান অবস্থায় হস্তান্তর করা হবে। পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, জনবল নিয়োগ এবং সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব থাকবে ইজারাদারের ওপর। বছরে অন্তত চার কিস্তিতে ইজারার অর্থ পরিশোধ করতে হবে। আবাসন, রেস্টুরেন্ট, কনফারেন্স, স্পা, পর্যটন, ভ্রমণ ও অন্যান্য সেবা চালুর মাধ্যমে আয় করার সুযোগ থাকবে। তবে নতুন কোনো ভবন নির্মাণ বা স্থায়ী কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক।প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের শুরুতে সার্ভিস এরিয়া নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল না। পরে প্রকল্প সংশোধনের মাধ্যমে আনোয়ারা প্রান্তে প্রায় ৭২ একরজায়গাজুড়ে সার্ভিস এরিয়া নির্মাণ করা হয়। এখানেই গড়ে তোলা হয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে সাত তারকা মানের এই অতিথিশালা।অতিথিশালাটিতে রয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার বর্গফুট আয়তনের ছয় কক্ষবিশিষ্ট একটি ভিআইপি বাংলো, সুইমিংপুল, ৩০টি পৃথক বাংলো, ৪৮টি মোটেল ইউনিট, আধুনিক সম্মেলন সুবিধা, রেস্টুরেন্ট এবং বিভিন্ন পর্যটন ও আতিথেয়তা অবকাঠামো। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় এটিকে উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় অতিথি, বিদেশি প্রতিনিধি এবং বিশেষ সফরকারীদের আবাসনের উপযোগী করে নির্মাণ করা হয়।সংশ্লিষ্টদের মতে, কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা। এর বড় অংশই ঋণ হিসেবে দিয়েছে চীন। ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর টানেলটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হলেও একই প্রকল্পের আওতায় নির্মিত এই বিলাসবহুল অতিথিশালা আজও চালু হয়নি। ফলে বিপুল বিনিয়োগের এ অবকাঠামো কোনো ধরনের আর্থিক সুফল দিচ্ছে না।পর্যটন খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পারকি সৈকতের খুব কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এই অতিথিশালাটি আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্ট, কনভেনশন সেন্টার কিংবা পর্যটন কমপ্লেক্স হিসেবে পরিচালনার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষ ব্যবস্থাপনায় এটি শুধু কর্ণফুলী টানেলের রাজস্বই বাড়াবে না, বরং আনোয়ারা ও চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।কর্ণফুলী টানেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সৈয়দ রজব আলী বলেন, অতিথিশালাটি নির্মাণের পর থেকে চালু করা সম্ভব হয়নি। পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নেই। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এটি বাণিজ্যিকভাবে ইজারা দেওয়া হবে। আগামী ১৩ জুলাই পর্যন্ত দরপত্র গ্রহণ করা হবে। এরপর সর্বোচ্চ দরদাতার সঙ্গে ২৯ বছরের জন্য চুক্তি করা হবে।এদিকে, জনপ্রশাসন ও অবকাঠামো বিশ্লেষকদের মতে, শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো বছরের পর বছর অব্যবহৃত থাকলে রাষ্ট্রীয় অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তাই দরপত্র প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে দ্রুত এই সম্পদকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, এতে সরকারের রাজস্ব বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং কর্ণফুলী টানেলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে নতুন পর্যটন ও সেবা অর্থনীতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর