সবুজ অরণ্য-ঃ
সময়টা তখন মিলেনিয়াম দশকের প্রথম পথচলায়, পঁচিশ জুলাই দুই হাজার পাঁচ। চট্টলার আকাশজুড়ে সফেদ মেঘ, নগরিক জীবনের যাপিত নাট্যভূমে বসত শুরু করলো নূতন একটি নাট্য পরিবার। দেখতে দেখতে গত ২৫ জুলাই’২৬ পরিবারটি
তার শৈশব-কৈশোর আর তারুণ্য পেড়িয়ে পা রাখলো আজ যৌবনদীপ্ত একুশের চৌঁকাঠে। নিঃসন্দেহে আজকের দিনে বীর প্রসবিনী এই চট্টলার বুকে শীর্ষস্থানীয় নাট্য পরিবার ‘থিয়েটার স্লোগান’।আজ থিয়েটার স্লোগান দুই-যুগ’র চৌঁকাঠ পেড়িয়ে একুশের আঙ্গিনায় পা রাখার প্রাক্কালে যার নাম উল্লেখ না করলেই নয়, তিনি হলেন লালন দাশ। চট্টগ্রামের গ্রুপ থিয়েটার অঙ্গনে একজন নাট্যঅন্তপ্রাণ একটি নাম। নাটক যার ধ্যান, জ্ঞান আর সাধনা। যার শরীরের প্রতিটি রক্ত কণা যেন অবিরত পাঠ করে চলে নাটকের বর্ণমালা। তাঁর কাছে মঞ্চ যেন মায়ের আঁচলে পাতা শান্তির নিবাস। নাটকের পটভূমি, সংলাপ আর নির্মাণ চিন্তন যেন শরীর। আর নাট্যভূমে রচিত হয় যার সংসার। এ যেন চট্টল নাট্যাঙ্গন আর থিয়েটার মঞ্চে নাটকের বরপুত্র।তাঁর সাথে ছায়া সঙ্গী হয়ে আছে আরেক পুস্প পাপড়িসম কণ্ঠশিল্পী, নাট্যশিল্পী আর তুখোড় সংগঠক ‘প্রীতিকণা দাশ।’ এ যেন কবির ভাষায় রচিত কাব্য “বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি, যাহা চীর কল্যাণকর; অর্ধেক তার গড়িয়াছে নারী,অর্ধের তার নর” এর সার্থক রুপায়ণ। যার স্পর্শ, মমতা, সহযোগিতা, সহমর্মিতা আর শক্তি না পেলে অধরাই থেকে যেত লালন দাশ’র নাট্যপুত্র হয়ে উঠার আঙ্গিনা।থিয়েটার স্লোগান-চট্টগ্রাম’র প্রতিষ্ঠাকালীন যারা সদস্য ছিলেনতাঁদের অনেকের-ই আজ দলের সাথে কোন যোগাযোগ নেই; হয়তো স্বীয় ভাগ্য সুপ্রসন্ন করতে পাড়ি জমিয়েছেন ভিন্ন কোন দেশে। গড়ে তুলেছেন বর্ণাঢ্য কর্মজীবন, কিন্তু রয়ে গেছে দলের প্রতি তাঁদের ত্যাগ, সহযোগিতা আর সহমর্মিতার নির্যাস। থিয়েটার স্লোগান পরিবার আমৃত্যু তাঁদের কাছে ঋণি হয়ে রইলো।সেদিন পুরনো দল থেকে একযোগে পদত্যাগ করে (প্রাসঙ্গিক কারণে পুরনো দলের নামটি উচ্চারণ না করাই বাঞ্ছনীয় বলে উল্লেখ করা গেলোনা) থিয়েটার স্লোগান গঠন থেকে নাটকের প্রতি অনিকেত প্রেমের টানে এখনো যারা থিয়েটার স্লোগান’র সাথে আবদ্ধ হয়ে আছে প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষভাবে, তাঁদের সবার প্রতি অতলান্ত শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি এবং যাপিত নাট্য চর্চ্চায় অনুজ আর নবীন নাট্যকর্মী যারা তাদের শ্রম-অর্থ- সময় দিয়ে নাট্য প্রদর্শনী আর থিয়েটার চর্চ্চাকে বেগবান রেখেছেন তাদের সবার প্রতি অকিঞ্চন ভালোবাসা।আজ যারা দলে নিয়মিত নাট্যচর্চ্চা করছেন তাঁরা অনেকেই থিয়েটার স্লোগান’র মহিরুহ অবস্থানটুকু দৃষ্টিসীমায় অঙ্কিত করছেন, দেখেননি এর প্রসব বেদনা। কেননা সৃষ্টি আর সৃজনশীলতা বরাবরই কঠিন আর কষ্টদায়ক।২৫ জুলাই’০৫ যে দীপ্ত শপথে অনড় হয়ে জন্ম নিয়েছিলো থিয়েটার স্লোগান। সেদিন-ই ঘোষিত হয়েছিলো স্লোগান পরিবার’র জন্মে নতুন এক নাট্যদ্বার উন্মোচিত হওয়ার শপথ চট্টলায়। যারা শুধু বুকে ধারণ করবে বারুদ। নাটকের প্রতিটি সংলাপ হবে ফলার মতো, দলের প্রতিটি সদস্য হবে ধনুকের তীরের মতো, যাদের অভিষ্ট লক্ষ্যই হবে দলকে সাফল্যের সাথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মাইলফলকে। যাদের শপথ মন্ত্রই ছিল “আমরা কারো প্রতিদ্বন্দ্বীনই, আমরাই আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী”।শেষ বিকেলের সূর্য্য সেদিনও ছিলো সন্ধ্যার উঠোনে রাত্রির অতিথী হয়ে। তাকে সাক্ষী রেখেই আমাদের নাট্য শিক্ষক লালন দাশ’র (দাদাভাই) চোখের নোনা জলে ধূয়ে নিয়েছিলাম আমরা ফেলে আসা পাথরঘাটার পাঁচবাড়ির চিলেকোঠার নোংরা সময়কে। কথা রেখেছি আমরা, কথা রেখেছে স্লোগান পরিবার’র প্রত্যেক অগ্রজ, অনুজ, বন্ধুপ্রতীম সদস্য। যারা শুরু থেকেই নাট্য যুদ্ধের সারথি হয়ে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন মৃত্যু অবধি।সেদিন জন্ম নিয়েছিলো যে নবজাতক, যার জন্মে যাত্রা শুরু হয়েছিলো এক সদ্যজাত শিশু নাট্যদল’র। আজ সে রেখেছে পা একুশের উঠোনে। সেদিন’র পূর্বাকাশে যেমনটি ছিলো নতুন দিনের আলো হামাগুড়ি দেয়ার চেষ্টা, আজো তা তেমনি আছে। মাঝে শুধু পাল্টেছে কিছু সময়। পাল্টে যাওয়া কেলেন্ডারের পাতার মতো এগিয়েছে থিয়েটার স্লোগান, পেয়েছে সমৃদ্ধির পরশ।পরিবার’র সাফল্যের ঝুড়িতে যুক্ত হয়েছে আটাশটি স্বরচিত নাটক, এগারোটি গল্পের নাট্যরূপ আর নাটকের অর্ধসহস্র মঞ্চায়ন এবং বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন’র স্থায়ী সদস্যপদ প্রাপ্তির পালক।এছাড়া প্রাপ্তির শেকড়ে আরো যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদ, বাংলাদেশ ঋতুভিত্তিক নাট্যমেলা পরিষদ, বাংলাদেশ অনুনাটক পরিষদ এবং থিয়েটার ক্লাব’র মতো শীর্ষস্থানীয় নাট্য মোর্চ্চার সম্মান সূচক সদস্যপদের সফেদ পালক।আজ থিয়েটার স্লোগান পরিবার ২১তম জন্মদিনে আমাদের অন্তরআত্মা, আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের অস্তিত্বের পঁচিশ জুলাই কে শ্রদ্ধার সাথে হৃদয়ে ধারন করে সকল নাট্যজন, নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক, দলপ্রধান, নাট্যকর্মী, আলোকসজ্জাকর, সেট পরিকল্পক, রূপসজ্জাকার, নেপথ্যে সংগীতশিল্পী সর্বোপরি নাট্যপিপাশুদের জানাই থিয়েটার স্লোগান পরিবার’র পক্ষ থেকে সশ্রদ্ধ সালাম, অতলান্ত শ্রদ্ধা ও অগণন শুভেচ্ছা।
Leave a Reply