মো. সাইফুল ইসলাম, আনোয়ারা (চট্টগ্রাম)
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও বন্যায় চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার সড়ক যোগাযোগ, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পানি নেমে যাওয়ার পর সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রাথমিক জরিপে ক্ষতির প্রকৃত চিত্র সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার প্রায় ১০০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২ হাজার ৫৭২ হেক্টর জমির আউশ ধান, আমনের বীজতলা, সবজি ও ফলের বাগান নষ্ট হয়েছে। বন্যার পানিতে ভেসে গেছে অন্তত ১ হাজার ১০০টি পুকুর ও ১৫টি মৎস্যঘেরের মাছ। প্রাণিসম্পদ খাতেও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ শত কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে চূড়ান্ত জরিপ শেষ হলে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করছেন। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো ও উৎপাদন খাত পুনরুদ্ধারে সরকারের কাছে বরাদ্দ চেয়ে পৃথক প্রতিবেদন পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।উপজেলা প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা গেছে, পরৈকোড়া, হাইলধর, বটতলী, রায়পুর, জুঁইদণ্ডীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়কে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কোথাও সড়কের পিচ উঠে গেছে, কোথাও ধসে দুই ভাগ হয়ে পড়েছে। অনেক স্থানে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সড়কের পাশের মাটি সরে গিয়ে শত শত গাছ উপড়ে পড়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের (পিআইও) আওতায় সম্প্রতি নির্মিত কয়েকটি ইটের সড়কও পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। এলজিইডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারে শত কোটি টাকার কাছাকাছি বরাদ্দ প্রয়োজন হতে পারে।উপজেলা কৃষি অফিসের প্রাথমিক হিসাবে ২ হাজার ১৯২ হেক্টর আউশ ধান, ৮০ হেক্টর আমনের বীজতলা, ৩৫৯ হেক্টর সবজি এবং ১৩ হেক্টর ফলের বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতির আর্থিক মূল্য প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। কৃষি বিভাগ বলছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সবজি চাষে। অনেক কৃষক আউশ ধান কাটার প্রস্তুতি নিলেও বন্যার পানিতে সেই ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। পানি দীর্ঘ সময় জমে থাকায় কিছু এলাকায় জমির উর্বরতা ও পরবর্তী মৌসুমের আবাদও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, বন্যার পানিতে অন্তত ১ হাজার ১০০টি পুকুর ও ১৫টি বাণিজ্যিক মৎস্যঘের প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। অনেক ক্ষুদ্র মৎস্যচাষী তাদের পুরো পুঁজি হারিয়ে পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আলী আজম জানান, প্রাথমিকভাবে প্রাণিসম্পদ খাতে প্রায় ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় চারটি গরু মারা গেছে। এছাড়া ৪০টি পোলট্রি খামারের চার হাজারের বেশি মুরগি মারা গেছে এবং অন্তত ২৮০ জন খামারি ক্ষতির মুখে পড়েছেন।উপজেলা প্রকৌশলী মো. জাহেদুল আলম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের তালিকা প্রস্তুত করে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কার কাজ শুরু করা হবে।উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শামীম আহমেদ বলেন, বন্যায় কৃষকদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সবজি, আউশ ধান ও আমনের বীজতলায়। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। সরকারি সহায়তার আওতায় তাদের বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ দেওয়া হবে।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন বলেন, টানা বৃষ্টিতে আনোয়ারায় দীর্ঘস্থায়ী বন্যা না হলেও বিভিন্ন খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক বাড়িঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব বিভাগের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য একত্র করে সরকারের কাছে পাঠানো হচ্ছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, মৎস্যচাষী ও অন্যান্য পরিবারকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।স্থানীয়দের দাবি, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিবেচনায় দ্রুত বিশেষ পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার, কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ, মৎস্যচাষী ও খামারিদের আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা না হলে উপজেলার গ্রামীণ অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে দীর্ঘ সময় লাগবে।
Leave a Reply