আজ ১৩ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এক যুগের অপেক্ষার অবসান, ২৭ জুলাই উদ্বোধন হচ্ছে আনোয়ারার চায়না ইকোনমিক জোন

মোঃ সাইফুল ইসলাম, আনোয়ারা (চট্টগ্রাম)

একনেকে অনুমোদনের এক মাসের মাথায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের যাত্রা, শিল্পায়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে নতুন প্রত্যাশা দীর্ঘ এক যুগের অপেক্ষা, নীতিগত সিদ্ধান্ত, ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন ও প্রশাসনিক জটিলতার নানা ধাপ পেরিয়ে অবশেষে বাস্তব রূপ পাচ্ছে চট্টগ্রামের আনোয়ারার বহুল আলোচিত চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (CEIZ)। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে প্রকল্পটি নিয়ে সমঝোতা হওয়ার পর দীর্ঘ সময় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ধীরগতিতে এগোলেও চলতি বছরের ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেয়। এর মাত্র এক মাসের ব্যবধানে আগামী ২৭ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগনির্ভর এই শিল্পাঞ্চল।উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), চীনের রাষ্ট্রদূত, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (CRBC) প্রতিনিধি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী, কূটনীতিক এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেবেন। একই অনুষ্ঠানে সাব-লিজ চুক্তি, ওয়ান স্টপ সার্ভিস উদ্বোধন, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।বাংলাদেশ সরকার ও চীনের সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) সহযোগিতায় আনোয়ারার কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠছে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল। প্রকল্পের আওতায় আন্তর্জাতিক মানের সড়ক, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহ, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), জেটি, গুদাম, আধুনিক লজিস্টিক সুবিধা এবং শিল্প অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। মোট প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দেবে চীন এবং অবশিষ্ট অর্থ দেবে বাংলাদেশ সরকার।বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) জানিয়েছে, কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলকে আন্তর্জাতিক উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। এখানে ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল, গার্মেন্টস, ফার্মাসিউটিক্যালস, হালকা প্রকৌশল, রাসায়নিকসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে কমপক্ষে ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি এক লাখের বেশি মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ, নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও এ প্রকল্প থেকে জিডিপিতে কত শতাংশ বা কত টাকার প্রবৃদ্ধি যোগ হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি।চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন বাস্তবায়নের মাধ্যমে দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্পায়নের নতুন যুগের সূচনা হবে। এই প্রকল্প দেশের বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়াবে, রপ্তানি সক্ষমতা শক্তিশালী করবে এবং স্থানীয়সহ জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, কর্ণফুলী টানেলকে কেন্দ্র করে সরকারের যে শিল্পায়ন পরিকল্পনা রয়েছে, এই প্রকল্প সেটিকে বাস্তবে রূপ দেবে এবং জাতীয় অর্থনীতির পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন বলেন, চায়না ইকোনমিক জোনের কার্যক্রম শুরু হলে আনোয়ারার আর্থ-সামাজিক চিত্র বদলে যাবে। স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন, পরিবহন ও সেবাখাতে নতুন অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হবে। তিনি বলেন, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে টেকসই শিল্পায়নের মাধ্যমে আনোয়ারাকে দেশের অন্যতম আধুনিক শিল্পাঞ্চলে পরিণত করার লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।অর্থনীতিবিদদের মতে, কর্ণফুলী টানেল চালুর পর দক্ষিণ চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। সেই বাস্তবতায় চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের সফল বাস্তবায়ন শুধু আনোয়ারা বা চট্টগ্রাম নয়, বরং বাংলাদেশের শিল্পায়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন ভিত্তি তৈরি করতে পারে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রকল্পটির উদ্বোধন তাই দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর