২০শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৪ঠা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সওজের স্থাপনা অপসারণে ৩ কোটি টাকার সম্পদ, সরকারি কোষাগারে জমা মাত্র ৩০ লাখ!

প্রকাশিত হয়েছে-

মোঃ সাইফুল ইসলাম, আনোয়ারা (চট্টগ্রাম)

কর্ণফুলী টানেল সংযোগ সড়ক ছয় লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পে অধিগ্রহণ করা স্থাপনা ভাঙা ও অপসারণের কাজ ঘিরে প্রায় ৩ কোটি টাকার সম্পদের হিসাব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থাপনা ভেঙে পাওয়া লোহা, ইট ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী বিক্রি এবং একাধিক ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ অক্ষত রাখার বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অথচ সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে মাত্র ৩০ লাখ টাকা। বাকি অর্থ কোথায় গেল, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। এ ঘটনায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে।অভিযোগের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের হিসাব। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অধিগ্রহণ করা জমির মালিকদের স্থাপনার ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকার প্রায় ৫০ কোটি টাকা দিয়েছে। এরপর এসব স্থাপনা ভেঙে পাওয়া মূল্যবান নির্মাণসামগ্রী বিক্রি এবং সড়কের জায়গায় থাকা ভবনের অংশবিশেষ রেখে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। ফলে সরকারি অর্থে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পর স্থাপনা অপসারণ থেকে অর্জিত অর্থের কতটা সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, কর্ণফুলী টানেলকে ঘিরে যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ক্রসিং ওয়াই জংশন থেকে কালাবিবির দীঘির মোড় পর্যন্ত সড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয় সওজ। প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের আওতায় ফকিরনীর হাট, ফাজিলখাঁর হাট, বড়উঠান, চাতরী চৌমুহনী বাজার ও কালাবিবির দীঘির মোড়ের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে জমি অধিগ্রহণ এবং স্থাপনার ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ কার্যক্রমের পর ২০২৫ সালের ২ জুলাই ক্রসিং ওয়াই জংশন থেকে কালাবিবির দীঘির মোড় পর্যন্ত বিভিন্ন পাকা ও আধাপাকা স্থাপনা ভাঙা ও অপসারণের জন্য দরপত্র আহ্বান করে সওজ। অভিযোগ রয়েছে, প্রথম দরপত্রেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে ‘মেসার্স জারা আয়রন মার্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা দর দেয়, যেখানে সওজের নির্ধারিত চাহিদা ছিল ২০ লাখ টাকা। একাধিকবার দরপত্র আহ্বানের প্রয়োজনীয়তা এবং প্রচলিত বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।অভিযোগ অনুযায়ী, স্থাপনা ভাঙার পর সেখান থেকে ২০০ টনের বেশি স্ক্র্যাপ লোহা, বিপুলসংখ্যক ইট এবং শত শত ট্রাক নির্মাণবর্জ্য বা রাবিশ বিক্রি করা হয়। এসব সামগ্রীর পরিমাণ ও বিক্রয়মূল্যের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ না হওয়ায় প্রকৃত আয় নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, স্থাপনা অপসারণের কাজ থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা আয় হলেও সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে মাত্র ৩০ লাখ টাকা। বাকি অর্থের হিসাব নির্ধারণে স্ক্র্যাপ বিক্রির রসিদ, ওজনের নথি, কার্যাদেশ এবং সরকারি রাজস্ব জমার চালান যাচাই করা প্রয়োজন।শুধু নির্মাণসামগ্রী বিক্রিই নয়, সড়কের জন্য অধিগ্রহণ করা জায়গায় একাধিক ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ রেখে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। ফাজিলখাঁর হাট এলাকায় সড়কের পূর্ব পাশে প্রায় ২০ ফুট বাই ৫০ ফুট অংশের একটি ভবন রেখে দেওয়ার বিনিময়ে মালিকের কাছ থেকে ১৩ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই এলাকার সড়কের পশ্চিম পাশে একটি তিনতলা ভবন না ভেঙে রাখার বিনিময়ে ১০ লাখ টাকা এবং আরও দুটি ভবনের অংশবিশেষ অক্ষত রাখার বিনিময়ে ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।চাতরী চৌমুহনী বাজারেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে ওয়ান মাবিয়া, হাজেরা মার্কেট, অগ্রণী ব্যাংক ভবন, একুশে প্লাজা ও আবুল হোসেন মার্কেটের সামনে সড়কের জন্য নির্ধারিত অংশ পুরোপুরি না ভেঙে রাখার বিনিময়ে মালিকদের কাছ থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৫০ লাখ টাকার বেশি নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব স্থাপনার কিছু অংশ এখনো দৃশ্যমান রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, স্থাপনা আংশিক বা সম্পূর্ণ রেখে দেওয়ার বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সওজের একজন সার্ভেয়ারের যোগাযোগ ছিল। সার্ভেয়ার সুভাষীষ চাকমার বিরুদ্ধে স্থাপনা অপসারণ এবং এ-সংক্রান্ত চুক্তির বিষয়গুলো দেখভালের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ফাজিলখাঁর হাট ও চাতরী চৌমুহনী এলাকায় বিভিন্ন স্থাপনা না ভাঙার বিনিময়ে অর্থ লেনদেন হয়েছে।এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জারা আয়রন মার্টের স্বত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তিনি দ্রুত স্থানীয় লোকজনকে ডেকে বুঝিয়ে স্থাপনা ভাঙার কাজ শেষ করবেন। কোনো ভবনের মালিকের কাছ থেকে ভবন রেখে দেওয়ার বিনিময়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, স্থাপনা ভাঙার কাজ করতে গিয়ে তিনি রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হুমকি ও হামলার শিকার হয়েছেন।অন্যদিকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা বলেন, সওজের জায়গায় থাকা ভবন ভাঙা ও অপসারণের কাজ এখনো চলমান। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না।অধিগ্রহণ করা স্থাপনা ভাঙা, বিপুল পরিমাণ আয় ও সরকারি রাজস্বের পরিমাণ নির্ধারণে দরপত্রের নথি, স্ক্র্যাপ বিক্রির হিসাব, অর্থ জমার চালান এবং সরেজমিনে স্থাপনা অপসারণের অগ্রগতি যাচাই করা জরুরি। জনস্বার্থে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তার দায় নির্ধারণ এবং সরকারি অর্থের সঠিক হিসাব প্রকাশের দাবি উঠেছে।