১১ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২৭শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৫’ এ প্রথম কোরিয়ান ইপিজেড প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করলেন চেয়ারম্যান কিহাক সাং

প্রকাশিত হয়েছে-

মো. সাইফুল ইসলাম, আনোয়ারা (চট্টগ্রাম)
পরিবেশ সংরক্ষণ, টেকসই শিল্পায়ন এবং দৃষ্টান্তমূলক বনায়ন কার্যক্রমে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেপিজেড) ‘জাতীয় বৃক্ষরোপণ পুরস্কার-২০২৫’-এ প্রথম স্থান অর্জন করেছে। দেশের পরিবেশ ও বন সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য দেওয়া এই মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় সম্মাননা ৯ জুলাই ২০২৬ রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে গ্রহণ করেন ইয়াংওয়ান কর্পোরেশন ও কেপিজেডের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কিহাক সাং।একসময় কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী অনুর্বর ও পাহাড়ি ভূমিকে পরিকল্পিত সবুজ শিল্পাঞ্চলে রূপান্তর করার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের স্বীকৃতি হিসেবেই এই পুরস্কার পেয়েছে কেপিজেড। ধারাবাহিক বৃক্ষরোপণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশে টেকসই উন্নয়নের একটি অনন্য মডেল গড়ে তুলেছে।বেসরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল আইন, ১৯৯৬’-এর আওতায় প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত ২ হাজার ৪৯২ একর আয়তনের কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনের মোট জমির ৫২ শতাংশ বনভূমি, বোটানিক্যাল গার্ডেন, লেক, দীঘি ও উন্মুক্ত সবুজ এলাকা হিসেবে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। অবশিষ্ট ৪৮ শতাংশ জমিতে গড়ে উঠেছে পরিবেশসম্মত শিল্প ও অবকাঠামো।
১৯৯৯ সালে প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের পর থেকে কেপিজেড এলাকায় প্রায় ৩০ লাখ গাছ রোপণ করা হয়েছে। প্রতি বছর আরও প্রায় ২ লাখ গাছ লাগানোর কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের জরিপে এ এলাকায় ৪০০টিরও বেশি উদ্ভিদ প্রজাতির উপস্থিতি শনাক্ত ও নথিভুক্ত হয়েছে।কেপিজেডে গড়ে তোলা হয়েছে ৬০ একর আয়তনের একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন, যেখানে বর্তমানে বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় প্রজাতিসহ প্রায় ১ হাজার ৪০০ প্রজাতির উদ্ভিদ সংরক্ষিত রয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ১ হাজার ৮৫০-এ উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাস্তবায়িত হলে এটি দেশের বৃহত্তম সংরক্ষিত বোটানিক্যাল গার্ডেন হিসেবে গবেষক, শিক্ষার্থী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে।পানি সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় কেপিজেডে ৩৭টি জলাধার নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে ৬০ কোটি গ্যালনেরও বেশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব। ভবিষ্যতে এর ধারণক্ষমতা ১০০ কোটি গ্যালনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পুনরুদ্ধার করা এই বাস্তুতন্ত্রে বর্তমানে ২৯২ প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১৫৯ প্রজাতির পাখি, ৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ৭ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ৮৬ প্রজাতির প্রজাপতি এবং ২০ প্রজাতির ড্রাগনফ্লাই ও ড্যামসেলফ্লাই।নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের অংশ হিসেবে কেপিজেডে ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ মেগাওয়াটের স্থাপনা ইতোমধ্যে চালু রয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশগত মান রক্ষায় সব কারখানায় আধুনিক বর্জ্য পানি শোধনাগার (ইটিপি) পরিচালিত হচ্ছে।এ পর্যন্ত কেপিজেডে ৫৩টি আধুনিক শিল্প ইউনিট নির্মাণ করা হয়েছে, যার মোট আয়তন ৭০ লাখ বর্গফুটের বেশি। বর্তমানে আরও ২৭টি প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলছে এবং ৩৮টি নতুন প্রকল্প পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। টেক্সটাইল জোনে ইতোমধ্যে কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পাঁচটি বৃহৎ কারখানা স্থাপিত হয়েছে, যার সম্মিলিত আয়তন প্রায় ২০ লাখ বর্গফুট। এসব কারখানা দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।শিল্প অবকাঠামোর পাশাপাশি ১০০ একরের একটি আইটি পার্ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, শ্রমিক আবাসন এবং দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করছে কেপিজেড। এর লক্ষ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে একটি সমন্বিত শিল্প বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলা।বর্তমানে কেপিজেডের বিভিন্ন কারখানায় ৪০ হাজারের বেশি শ্রমিক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন, যাদের প্রায় ৭৫ শতাংশ নারী। প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে ৮১ হাজারের বেশি প্রত্যক্ষ এবং প্রায় দেড় লাখ পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।ইয়াংওয়ান কর্পোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা কিহাক সাং ১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে আসছেন। পরিবেশ সংরক্ষণ, শ্রমিক কল্যাণ এবং টেকসই শিল্পায়নকে বিনিয়োগের মূল দর্শন হিসেবে গ্রহণ করায় প্রতিষ্ঠানটি দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ‘জাতীয় বৃক্ষরোপণ পুরস্কার-২০২৫’ শুধু কেপিজেডের একটি অর্জন নয়, বরং শিল্পায়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে মডেল গড়ে তোলা সম্ভব, তারই একটি উজ্জ্বল জাতীয় স্বীকৃতি।