১৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৫ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আনোয়ারায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদন

প্রকাশিত হয়েছে-

মোঃ সাইফুল ইসলাম আনোয়ারা (চট্টগ্রাম)

এক লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা, চট্টগ্রাম হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার নতুন শিল্প ও রপ্তানি কেন্দ ।চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় প্রায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি অত্যাধুনিক চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (Chinese Economic and Industrial Zone) স্থাপনের প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে গৃহীত এই প্রকল্পকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।মঙ্গলবার (১৬ জুন) রাজধানীর সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা হিসেবে দেবে চীন সরকার। অবশিষ্ট অর্থ বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি শুধু একটি শিল্পাঞ্চল নয়, বরং বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নতুন শিল্পবিপ্লবের সূচনা হতে পারে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শিল্পাঞ্চলটি চালু হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে স্থানীয় যুবসমাজের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে, পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে ওঠার সুযোগও বাড়বে। এছাড়া প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে বস্ত্র ও পোশাক শিল্প, ওষুধশিল্প, হালকা প্রকৌশল, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদন, প্লাস্টিক শিল্প, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ এবং রপ্তানিমুখী বিভিন্ন শিল্প খাতে চীনা বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ দেখাতে পারেন বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বেজা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার ভিত্তিতে আনোয়ারা উপজেলার প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর শিল্পাঞ্চলটি গড়ে তোলা হবে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলটি বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, প্রস্তাবিত বে টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় শিল্পাঞ্চলটি দেশের অন্যতম কৌশলগত অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রবন্দর ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ থাকায় উৎপাদিত পণ্য দ্রুত রপ্তানি করা সম্ভব হবে। ফলে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে। ওই বছর চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)-এর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে শিল্পাঞ্চলের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলেও ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়ন কাঠামো নির্ধারণ, কারিগরি মূল্যায়ন এবং নীতিগত বিভিন্ন জটিলতার কারণে প্রকল্পটির অগ্রগতি দীর্ঘদিন আটকে ছিল। প্রথমে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (সিএইচইসি)-কে সম্ভাব্য ডেভেলপার হিসেবে বিবেচনা করা হলেও চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়ায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হতে পারেনি। পরে ২০২২ সালে চীনা সরকারের সুপারিশে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি)-কে নতুন ডেভেলপার হিসেবে নির্বাচন করা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চূড়ান্ত ডেভেলপার চুক্তি সম্পাদনের কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে বেজা। প্রকল্পের আওতায় একটি আন্তর্জাতিক মানের শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
এর মধ্যে রয়েছে: ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি সংযোগ সড়ক, ৩৩০ মিটার দীর্ঘ সেতু, ১ হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ চার লেনের সড়ক, ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, ২৫ মিলিয়ন লিটার ধারণক্ষমতার কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি)গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র (সাবস্টেশন)বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, জলাধার ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানা প্রাচীর।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পাবে। শিল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সিইটিপি স্থাপন করা হবে।বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী সম্প্রতি বলেছেন, চীনা পক্ষের সঙ্গে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং উভয় দেশই প্রকল্পটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়ন করতে চায়। তিনি বলেন, চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন অধ্যায় শুরু হবে। এটি শুধু চট্টগ্রাম নয়, পুরো দেশের শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কর্ণফুলী টানেল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, বে টার্মিনাল, আনোয়ারা-কর্ণফুলী শিল্পবেল্ট এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সম্প্রসারণ প্রকল্পগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এই শিল্পাঞ্চল বাস্তবায়ন করা গেলে পুরো অঞ্চলটি একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক করিডরে পরিণত হবে। তাদের মতে, শিল্পাঞ্চলটি চালু হলে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান উৎপাদন, সরবরাহ ও রপ্তানি কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার পথে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ডেভেলপার চুক্তি ও অর্থায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরপরই মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই শিল্পাঞ্চলটি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে।